অবহেলার সীমানায়


গল্প: অবহেলার সীমানায়

অনন্যার ভালোবাসায় কখনো কোনো শর্ত ছিল না। আকাশের মতো নিঃস্বার্থ আর নদীর মতো স্বচ্ছ ছিল তার আবেগ। সকালের এক কাপ চা থেকে শুরু করে সারাদিনের ক্লান্তি শেষে রাত জেগে অসীমের ফিরে আসার অপেক্ষা—সবকিছুতেই ছিল ছায়াময় ছোঁয়া। অনন্যা কখনো অসীমের কাছ থেকে বড় কোনো দাবি করেনি, চেয়েছিল শুধু এক চিলতে আন্তরিকতা আর একটুখানি যত্ন।

কিন্তু অসীম সেই সহজ সত্যিটাকে সহজভাবে নিতে পারেনি। অনন্যার ভালোবাসাকে সে ধরে নিয়েছিল তার 'অধিকার' বা 'স্বভাব' হিসেবে। ছোট ছোট অবহেলা, কথায় কথায় ধমক আর অকারণ দূরত্ব তৈরি করাটাই যেন অসীমের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। অনন্যা কষ্ট পেলেও নীরবে চোখ বুজে সয়ে যেত, কারণ সত্যি কারের ভালোবাসায় তো জেদ বা অভিমানের ছলছাতুরি থাকে না।

একদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। অনন্যা ভীষণ অসুস্থ হয়ে ঘরে একা বসে ছিল। সে অসীমকে ফোন করে শুধু বলেছিল, "আজ একটু তাড়াতাড়ি আসবে? শরীরটা ভালো লাগছে না।" কিন্তু অসীম বিরক্ত হয়ে ফোনটা কেটে দিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতে রইল।

রাত অনেক করে অসীম যখন বাড়ি ফিরল, দেখল ঘরের আলো নেভানো। টেবিলে তার প্রিয় খাবারগুলো সুন্দর করে ঢাকা, কিন্তু অনন্যা বিছানায় চুপচাপ শুয়ে আছে। তার চোখের কোণে তখনও শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ। অসীম কাছে গিয়ে স্পর্শ করতেই অনন্যা শান্ত গলায় বলল, "তুমি যখন ব্যস্ত থাকো, আমি কষ্ট পাই না অসীম। আমি কষ্ট পাই এটা ভেবে যে, আমার নিঃশর্ত ভালোবাসার কোনো দাম তোমার কাছে নেই। মানুষ শরীর ভাঙলে সহে যায়, কিন্তু মন ভাঙলে আর জোড়া লাগে না।"

সেই রাতে অনন্যার শান্ত কিন্তু বেদনার্ত কণ্ঠ অসীমের বুকের ভেতরটা নাড়িয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, অনন্যা কোনো নাটক করছিল না; তার নিঃশব্দ কান্না আর সহনশীলতার পেছনে ছিল এক গভীর ভালোবাসা। কিন্তু অসীম যখন অনুতপ্ত হয়ে অনন্যার হাত ধরতে গেল, অনন্যা তখন অনেকটা দূরে সরে গেছে—অভিমান নয়, নিঃস্বাদে ক্লান্তিতে।

পুরুষটি যদি সেদিনই সেই মায়াময় ভালোবাসার গভীরতা বুঝতো, তবে অনন্যাকে এমন নীরব কষ্টে ফেলার আগে তার বিবেক সত্যিই কেঁপে উঠতো।

No comments

আপনার মন্তব্য শেয়ার করুন।

Powered by Blogger.